হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, মরক্কোর প্রাচীন আল-কুতুবিয়া মসজিদের ৭০ মিটার উঁচু মিনার থেকে আজও মধুর আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। লালচে ইটের তৈরি এই মসজিদের মিনারটি প্রায় ৯০০ বছর ধরে মরক্কোর ভূখণ্ডের সর্বোচ্চ স্থান থেকে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করে আসছে।
মুসলমানদের ধর্মপালন, নামাজ আদায় ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সাক্ষী এই মিনার যেন তাদের জন্য দোয়াও করেছে। এ কারণেই তারা উসমানীয়, ইউরোপীয় কিংবা অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনতা থেকে তুলনামূলকভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পেরেছে।
আকাশছোঁয়া আল-কুতুবিয়া মিনার থেকে দিনে কয়েকবার আজানের সুমধুর ধ্বনি আজও আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। শহরে অসংখ্য মসজিদ থাকা সত্ত্বেও বহু মরক্কান মুসলমান এখনো এই মসজিদে দৈনন্দিন নামাজ আদায় করেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের মুসলিম পরিচয়কে পূর্বপুরুষদের ১,৩০০ বছরের ইসলামি ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত রাখেন।
তাঁরা মাওলা ইদ্রিসের স্মৃতির সঙ্গেও নিজেদের সম্পৃক্ত করেন। বাগদাদের আব্বাসীয় শাসকদের অত্যাচার থেকে পালিয়ে মাওলা ইদ্রিস মরক্কোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ইসলাম, ঐক্য এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধর্মের পতাকাতলে সংহতির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন।
মাওলা ইদ্রিস ছিলেন মহানবী (সা.)-এর বংশধর। তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহর পুত্র, আব্দুল্লাহ ছিলেন হাসান মুসান্নার পুত্র, আর হাসান মুসান্না ছিলেন ইমাম হাসান ইবনে আলী (আ.)-এর পুত্র। আব্বাসীয়দের অত্যাচার-নির্যাতনে পরিপূর্ণ সময়ে তিনি মরক্কোতে আশ্রয় নেন এবং উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন।
তিনি এমন এক বিশুদ্ধ ইসলামি ঐতিহ্যের প্রসার ঘটান, যা মরক্কোর বিভিন্ন গোত্রকে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। পরবর্তী সময়ে মরক্কোর মানুষ আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চল এবং স্পেন, পর্তুগাল ও দক্ষিণ ফ্রান্সের মতো এলাকায়ও ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখে।
মরক্কোর মানুষ ধর্মপ্রাণ হওয়ার পাশাপাশি জ্ঞান ও গ্রন্থচর্চার প্রতিও অনুরাগী ছিল। এমনকি মরক্কোর এই প্রাচীন মসজিদের নাম ‘আল-কুতুবিয়া’ রাখার কারণও হলো, এটি শহরের বই বিক্রেতাদের বাজারের কাছে অবস্থিত। এখনো মসজিদের পাশেই একটি বইয়ের বাজার চালু রয়েছে।
আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার মরক্কো আজও একটি ঐতিহ্যবাহী আরব-ইসলামি দেশ। দেশটি তার হাজার বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার ধরে রেখেছে। ইসলামের প্রভাবে এর নিজস্ব সংস্কৃতিও অর্থবহতা ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে। মসজিদগুলোর মিনার থেকে আজানের ধ্বনি যেন আলোর প্রবাহের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিদিন কয়েকবার এই আজান মুসলমানদের সৎকাজের দিকে আহ্বান করে এবং মন্দ কাজ, অনিষ্ট ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে দূরে থাকতে স্মরণ করিয়ে দেয়।
মরক্কোর মুসলমানরা বদলে যাননি। জেরুজালেমে ইহুদিবাদী দখলদারদের প্রবেশের সময় থেকেই তাঁরা স্বাধীনতাকামী, অন্যায়ের বিরোধী এবং ফিলিস্তিনি জনগণের দৃঢ় সমর্থক ছিলেন; এখনো আছেন।
কিন্তু দেশটির সরকার ধীরে ধীরে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলবর্তী কিছু আরব দেশের সরকারের মতো হয়ে উঠছে-যারা মার্কিন-ইহুদিবাদী শক্তির অনুগত এবং ইহুদিবাদী দখলদার শাসনের সঙ্গে শান্তি ও সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপর।
সরকার ও জনগণের মধ্যে এই দ্বৈততা দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। মরক্কোর জনগণ নিজেদের পথে চলছে, আর তাদের শাসকেরা যেন বিপরীত পথে হাঁটছেন। কবির ভাষায়: ভয় হয়, হে আরব বেদুইন, তুমি কাবায় পৌঁছাতে পারবে না; কারণ, তুমি যে পথে চলেছ, সে পথ তো তুর্কিস্তানের দিকে।
ইহুদিবাদী ‘এস্থার ও সালমা’ উৎসব বয়কটের প্রচারাভিযান
মরক্কোর জনগণ ও সরকারের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো দেশটিতে ইহুদিবাদীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক ও শিল্প উৎসব। এই উৎসব বয়কটের জন্য মরক্কোর জনগণ ‘ম্যাকবি’ (MACBI) প্রচারাভিযান শুরু করেছে।
এক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এই মরক্কান প্রচারাভিযানে ‘এস্থার ও সালমা’ উৎসবের তৃতীয় আসরে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত শিল্পী ও অংশগ্রহণকারীদের অনুষ্ঠান থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। উৎসবটি ১৬ মেহের থেকে বন্দরনগরী এসসাউইরায় শুরু হয়েছে এবং ১৯ মেহের, অর্থাৎ ১১ অক্টোবর রবিবার পর্যন্ত চলবে।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ‘ম্যাকবি’ প্রচারাভিযান জানিয়েছে, ‘এস্থার ও সালমা’ সমিতি ‘এসসাউইরা-মোগাদর’ সমিতির সহযোগিতায় এই উৎসবের আয়োজন করছে। তাদের অভিযোগ, উৎসবটিতে ইসরায়েলি শাসনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিভিন্ন উপাদান রয়েছে এবং এর আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি অংশ নিচ্ছেন।
মরক্কো ও ইসরায়েলি শাসনের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের অন্যতম বিশিষ্ট সমর্থক আন্দ্রে আজুলাই উৎসবটির আয়োজক সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ২০২৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আজুলাইকে প্রেসিডেন্সিয়াল সম্মাননা প্রদান করেছিলেন। এটি ওই শাসকগোষ্ঠীর প্রেসিডেন্টের দেওয়া সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।
এ বছরের উৎসব ‘অতিক্রমণ’ স্লোগানে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর কর্মসূচিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, সংগীত ও শিল্পকলা ছাড়াও নির্বাসন, স্মৃতি, পরিচয় এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সংলাপ নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক ও আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
‘ম্যাকবি’ প্রচারাভিযান নিজেদের ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি শাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক বয়কট আন্দোলন ‘প্যাকবি’ (PACBI)-এর সহযোগী হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা ১৮ মেহের, অর্থাৎ ১০ অক্টোবর শনিবার ‘নির্বাসনের ক্ষত’ শিরোনামে অনুষ্ঠিতব্য একটি গোলটেবিল বৈঠকেরও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
এই বৈঠকের পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ‘শালোম সালাম’ গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা মিশেল টুপম্যান। বৈঠকের দুই অতিথি হলেন ইসরায়েলি শাসনের ওপেন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডোনি শারবিত এবং ফিলিস্তিনের সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আনোয়ার আবু আইশা।
‘ম্যাকবি’ প্রচারাভিযান ১৯ মেহের, অর্থাৎ ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য উৎসবের আরেকটি বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ‘সীমানা, ভূরাজনীতি ও ধর্ম’ শিরোনামের এই বৈঠকে ফরাসি-ইসরায়েলি রাব্বি-প্রশিক্ষণার্থী মেলিনা কার্তোভস্কি-আইয়াশ, হিশাম দিনার, আবদুল্লাহ উজিতান এবং ম্যানুয়েল পেনিকোর অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
‘ম্যাকবি’ প্রচারাভিযানের মতে, এ ধরনের বৈঠকে ইসরায়েলি, ফিলিস্তিনি ও মরক্কান অংশগ্রহণকারীদের একত্রিত করা তাদের প্রচারাভিযানের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আওতায় পড়ে।
ইসরায়েলি অভিনেত্রী ও পরিচালক রোনিত এলকাবেতজকে উৎসবের ‘প্রতীকী ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে নির্বাচন করাও উৎসবটির বিরুদ্ধে আরেকটি সমালোচনা। তাঁর ভাই, ইসরায়েলি পরিচালক শ্লোমি এলকাবেতজ ১৪০৩ ফারসি সালে অনুষ্ঠিত উৎসবের প্রথম আসরে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। সে সময় তাঁর পরিচালিত চারটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল।
আপনার কমেন্ট